২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার জুলাই-আগস্টের সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদ হটানোর বীরত্বগাথা বিজয়ের নেপথ্যের কারিগর ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছাত্র-জনতার এমন অবিস্মরণীয় সাফল্যের পেছনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মানুষটি ছিলেন তিনি। তবে বিএনপি কখনোই দাবি করেনি, গণঅভ্যুত্থান তাদের আন্দোলনের ফসল। বরং বারবার বলেছে, এটি সবার আন্দোলন। এটি একক কারোর আন্দোলন ছিল না।
এই গণঅভ্যুত্থান সবার; প্রতিটি গণতন্ত্রকামী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের। কোটা সংস্কারের মতো সামাজিক আন্দোলনকে পুরো রাজনৈতিক রূপ দেন তারেক রহমান। দুর্বার গতিতে আন্দোলন টেনে নিয়ে চূড়ান্ত সফল হন। শেখ হাসিনা পতনের পর জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও বলেছেন, আন্দোলনের নেপথ্যের কারিগর ছিলেন তারেক রহমান। তিনি নিয়মিত ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। দিতেন নানা পরামর্শ। উনার পরামর্শে পরিচালিত হয়েছে আন্দোলন। ছাত্রদের পাশাপাশি প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য ব্যক্তিকে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিতেন। প্রবাসী, কূটনীতিক, সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রেখে আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেন তারেক রহমান। একটাই কথা বলতেন, আন্দোলনে হেরে গেলে, বাংলাদেশ হেরে যাবে। ১৮ জুলাইয়ের পর যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন সরাসরি টেলিফোনে দূত মারফত কথা বলতেন, নির্দেশনা দিতেন। পুরো আন্দোলনের সময় তারেক রহমান গড়ে তিন ঘণ্টা করে ঘুমিয়েছেন। এমনকি জামায়াতের অনেক নেতাও তখন তারেক রহমানের নির্দেশনার অপেক্ষায় ছিলেন, দূত মারফত নির্দেশনা নিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি যখন সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডামি নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন তারেক রহমান একটি বার্তা দিয়েছিলেন, আমি চাই হাসিনা-এমন একটি নির্বাচন করুক। কারণ সারা বিশ্ব দেখুক জনমত উপেক্ষা করে হাসিনা কত নগ্নভাবে ডামি একটি নির্বাচন করতে পারে। উনি সেই নির্বাচন আয়োজনের আগে আরো বলেছিলেন, বিতর্কিত ভোটের পর হাসিনাকে বিদায় নিতে হবে। উনার সেই বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটে জুলাই-আগস্টে এসে।
জুলাইয়ের শুরুতে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, তখন তারেক রহমান প্রাথমিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। তবে দলগতভাবে আন্দোলনে চূড়ান্ত অংশগ্রহণ শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ১৬ জুলাই আবু সাঈদ, ওয়াসিমরা শহিদ হলে হাসিনা পতনে এক দফার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আন্দোলনের সময় তারেক রহমান তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ২৩টি টুইট করেন, ১৫টি ফেসবুক পোস্ট দেন। সাত বার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীসহ দেশবাসীকে উজ্জীবিত করেন।
আন্দোলনের মাঝপথে ৯ দফা এবং ৮ দফায় ছাত্ররা যখন বিভক্ত হয়ে যান তখন আন্দোলনের লাটিম তুলে নেন তারেক রহমান। তিনি গত বছরের ২১ জুলাই জাতির উদ্দেশে ভাষণে ঘোষণা দেন ‘এক দফা এক দাবি, খুনি হাসিনার পদত্যাগ’। আন্দোলনকে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, মহিলা দলসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের কয়েকটি পয়েন্টে আন্দোলন ভাগ করে দেন। ছাত্রদলের সুপার ফাইভকে তিনি পাঁচটি পয়েন্টে ভাগ করে দেন। যুবদলকে দায়িত্ব দেন রামপুরায়। একইভাবে অন্যান্য সংগঠনসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে ফেলেন। ঢাকা শহরের ২১টি পয়েন্টে তিনি একক নিয়ন্ত্রণ করে আন্দোলন চালিয়ে যান। ডিবি হারুণের হেফাজতে ছয় সমন্বয়ক থাকা অবস্থায় আন্দোলন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য ঢাকার আশপাশ থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় অবস্থান করান তিনি। তাদের বিভিন্ন মাধ্যমে পয়েন্ট-ভিত্তিক আন্দোলনে নামান। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামান তারেক রহমান।
যখন ছয় সমন্বয়ককে জোর করে ডিবি হেফাজতে রাখা অবস্থায় আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়, তখনো কিন্তু আন্দোলন সারা দেশে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কার্যত তখন আর আন্দোলন ছাত্রদের হাতে ছিল না। একটি বিশেষ সাইবার নেটওয়ার্ক থেকে ডিবি হারুন এবং নানকের সেক্স স্ক্যান্ডাল সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যেটির কারণে হারুন এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের মনোবল ভেঙে যায়।
সাবেক ছাত্ররা যারা জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিল তারা কিন্তু ৩ আগস্টের আগে কখনোই হাসিনার পদত্যাগ দাবি করেনি। এ সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ তারা দেখাতে পারবে না। কিন্তু বিএনপির পক্ষে ১ আগস্ট হাসিনা পতনে চূড়ান্ত অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন তারেক রহমান। যেটি বাস্তবায়নে রাজপথে ঝাঁপিয়ে বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মী-শুভাকাঙ্ক্ষীরা। যে কারণে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি তথা চার শতাধিক শহিদের দল বিএনপি (১৪০ জনেরও বেশি ছাত্রদলের)। সবচেয়ে বেশি আহত যাহত ও ও পঙ্গু পঙ্গু নেতাকর্মীর দল বিএনপি, সবচেয়ে বেশি রাজপথের রাজ যোদ্ধার দলও বিএনপি। রেইড চালিয়ে পল্টনসহ দেশ জুড়ে বিএনপির অফিসগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, গ্রেফতার করা হয়েছিল হাজার হাজার নেতাকর্মীকে, রিমান্ডে নিয়ে চালানো হয়েছিল পাশবিক নির্যাতন। রাজপথে সক্রিয় ছিলেন বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী, অঙ্গ-সহযোগী ও পেশাজীবী প্রতিটি সংগঠনের সদস্য এবং নিবেদিতপ্রাণ সমর্থকেরা; ঠিক যেমন নেমে এসেছিলেন বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রেণি, পেশা ও অবস্থানের ফ্যাসিবাদবিরোধী মানুষ। ভূমিকা রেখেছিলেন দেশ-প্রবাসের অগণিত অন্তঃপ্রাণ দেশপ্রেমিকরাও।
৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন হাসিনা পতনের জন্য ৬ আগস্ট ঢাকায় অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়; তখন কিন্তু আন্দোলন এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট করা হয় বিএনপির পরামর্শে। সেই মোতাবেক হাসিনাকে বিতাড়িত করে ছাত্র-জনতা। হাসিনা পতনের দিনই নাহিদ-আসিফরা চ্যানেল টোয়েন্টিফোর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও তার মেয়ে জায়মা রহমানের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে। ছাত্ররা যখন ৬ আগস্ট আন্দোলনের ঘোষণা দেন, তখন তারেক রহমান আমাকে জানিয়েছিলেন আন্দোলনে বিরতি দেওয়া যাবে না। তখন আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পরামর্শে ছাত্রদের ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিলাম।