“বাবা মারা গেছে তাতে কি সম্পত্তি তো বুঝে নিতে হবে তাই মৃত্যুর পর বাবার কাছ থেকে টিপ সই নিচ্ছে দলিলে-” এমন ক্যাপশনে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে । অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, উক্ত ব্যক্তির নাম মোঃ হোসেন খান। তিনি উইনম্যাক্স মোবাইলের স্বত্ত্বাধিকারী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্যারালাইসিসে ভুগছেন । একটি সম্পত্তি বিক্রি করার সময় তার কাছ থেকে টিপসই সংগ্রহ করার সময় এই ভিডিও ধারন করা হয়েছিল। তবে তিনি মারা যাননি, বরং জীবিত আছেন। সঙ্গত কারনে ফ্যাক্টওয়াচ এ সকল পোস্টকে মিথ্যা সাব্যস্ত করছে।
এসব ভিডিওতে দেখা যায়, টি-শার্ট পরিহিত একজন বয়স্ক ব্যক্তি একটি টেবিলের ওপাশে চেয়ারে বসে আছেন। তার চোখ খোলা, মুখ কিছুটা হা করা এবং দৃষ্টি কিছুটা ওপরের দিকে। এ অবস্থায় তিনি কোনো নড়াচড়া করছেন না। তাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকজন বসে এবং দাঁড়িয়ে আছেন। একজন ব্যক্তি তার আঙুল ব্যবহার করে কোনো একটি নথিতে পরপর কয়েকটি পৃষ্ঠায় টিপসই নিচ্ছেন।
অনুসন্ধান
হৃদয় মজনুর নামক একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী ১৪ই আগস্ট বিকাল ৫ টায় এই ভিডিওটি রিল হিসেবে আপলোড করেছিলেন। ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন, “winmax মোবাইল এর মালিকের কি অবস্থা হায়রে দুনিয়া” ।
এই রিল এ একজন প্রশ্ন করেন, তিনি কি মারা গিয়েছেন? উত্তরে হৃদয় মজনুর জানান, না, তিনি বেচে আছেন। আরেকজনের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এখানে জমি বিক্রি করার ঘটনা ঘটছে।
হৃদয় মজনুর এর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে জানা গেল, হৃদয় মজনুর উইনম্যাক্স মোবাইলের সাবেক সেলস ম্যানেজার ছিলেন।
উইনম্যাক্স এর ফেসবুক পেজে ১৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা বেজে ৮ মিনিটে একটি পোস্টে জানানো হয়, “সম্প্রতি আমাদের চেয়ারম্যান স্যারের সম্পর্কিত একটা ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু দুষ্কৃতকারী অসত্য তথ্য প্রচার করেছে যা একেবারেই উদ্দেশ্য প্রনোদিত এবং সম্পূর্ণ দন্ডনীয় অপরাধ। এ ব্যাপারে আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি।”
এম এইচ টেকনোলজি লিমিটেড এর সকল শুভাকাঙ্ক্ষীদেরকে অবহিত করিতেছি যে এই মিথ্যা গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হল।”
এছাড়া গত ১৫ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে এই পেজ থেকে একটি পোস্টের মাধ্যমে জানানো হয় যে, ‘এম এইচ টেকনোলজি লিমিটেড (Winmax Mobile) এর সম্মানিত চেয়ারম্যান জনাব মোঃ হোসেন খান স্যার এর জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা’ । এই শুভেচ্ছাবার্তায় ব্যবহৃত ছবির সাথে আলোচ্য ভিডিওতে দেখানো ব্যক্তির মিল রয়েছে।
এছাড়া ‘RHR telecom’ নামক একটি পেজ থেকে রাত ২ টায় একটি পোস্টে জানানো হয় , “উনি Winmax Mobile কোম্পানির সম্মানিত চেয়ারম্যান।উনি দীর্ঘদিন যাবত প্যারালাইজড অবস্থায় জীবনযাপন করছেন মৃত্যুবরণ করেননি। উনার কোম্পানির সাথে আমাদের দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ব্যবসা ছিলো। বনশ্রীতে ফ্যাক্টরি করার জন্য একটা জায়গা কেনা ছিল। ঐ জায়গাটা বিক্রি করা হয়েছে। বিভিন্ন পেইজে এই ভিডিও দেখে আমি তাদের সাবেক এক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে সত্যতা জানতে পারলাম।”
১৪ আগস্ট দুপুর ১২টা ৪৬ মিনিটে মাইলস্টোন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডেরর ম্যানেজিং ডিরেক্টর জনাব মাকসুদ জামিল তার প্রোফাইল থেকে ১ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও আপলোড করেন। এই ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি বলেন, “গতকালকে একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যে মৃত ব্যক্তি থেকে তার ছেলেমেয়েরা জমি রেজিস্ট্রি করে নিচ্ছে!(অথচ তিনি অন্যের কাছে জমি বিক্রি করে সেটি রেজিস্ট্রি দিচ্ছিলেন,এবং ওনার ছেলে মেয়েরা কেউ দেশে থাকেন না )বিষয়টি যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর ভাইরাল হয়!আমাদেরও নজরে আসে ওই ভদ্রলোক আমাদের খুব পরিচিত তিনি winmax mobile company স্বত্বাধিকারী। তাই আজকে আমরা সশরীরে সেখানে গেলাম।”ভিডিওতে জনাম হোসেন খান সাহেবকে বিকৃত স্বরে অল্প কিছু কথাবার্তা বলতে শোনা যায়। তাকে দুই হাত এবং পিঠ নড়াচড়া করতেও দেখা যায়। তবে তার চোখ এবং মুখ সার্বক্ষণিকভাবে খোলা ছিল। ভিডিওতে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের কথোপকথন থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি তার কোনো সন্তানদের কাছে এই সম্পত্তি বিক্রি করেননি, বরং বাইরের লোকের কাছে বিক্রি করেছেন।
খিলগাঁও সাব রেজিস্ট্রার অফিসের নকলনবীশ জনাব নুর আলম ( ফেসবুক নাম-Nobi Noor) ১৪ আগস্ট দুপুর ১২টা ১৭ মিনিটে একটি ‘লাইভ’ ভিডিও প্রচার করেন। এই ভিডিওতে জনাব হোসেন খান এর সামনে বসে জনৈক ব্যক্তি একে একে প্রশ্ন করেন, আপনার নাম কী, আপনি কি স্বেচ্ছায় এবং সুস্থভাবে এই জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন , কেউ কি আপনাকে জোর করে কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে জমি লিখিয়ে নিয়েছে ইত্যাদি? সব প্রশ্নের উত্তরে জনাব হোসেন খান ধীরে ধীরে একটু বিকৃত স্বরে উত্তর দেন। এসব কথোপকথান থেকে জানা যায়, তার নাম মোহাম্মদ হোসেন খান। তিনি স্বেচ্ছায় এই জমি বিক্রি করেছেন । কেউ তার কাছ থেকে জোর করে জমির দলিলে সই নিয়ে যায়নি।
এ সকল তথ্য প্রমাণ দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভিডিওতে দৃশ্যমান উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেননি বরং তিনি জীবিত। ফলে ফেসবুকে যেসকল পোস্টে তাকে ‘মৃত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেসকল পোস্টকে ফ্যাক্টওয়াচ ‘মিথ্যা’ সাব্যস্ত করছে।