বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসেই পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯৬ কোটি ডলার। অথচ গত বছর একই সময়ে এ খাতে রপ্তানি আয় ছিল ৩১৮ কোটি ডলার। এ হিসাবে গত বছরের তুলনায় এক বছর জুলাইয়ে পোশাক খাতে রপ্তানি আয় বেড়েছে ২৪.৫২ শতাংশ।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকদের জন্য খুশির খবর হলো, এ খাতে আয় বৃদ্ধির হার আরও তীব্র গতিতে বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের পোশাক খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার পোশাকশিল্পে। ভারত, পাকিস্তান ও চীনের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণে অনেক বিদেশি ক্রেতা তাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিচ্ছেন বাংলাদেশের দিকে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির কারণে
তৈরি পোশাক খাতের প্রতিনিধিদের মতে, আগস্টের শুরু থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতারা বাংলাদেশে নতুন অর্ডার দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছেন। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারমুখী ক্রেতাদের একটি অংশ নয়াদিল্লি, ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের বদলে ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন। এতে করে দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে অর্ডারের চাপ বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মনে করেন, সময়মতো শিপমেন্ট ও সঠিক ব্যবস্থাপনা হলে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ৩০–৩৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এমনকি চলতি অর্থবছরের মধ্যেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করার সম্ভাবনাও আছে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট এবং বন্দরের সীমিত সক্ষমতা দ্রুত সমাধান না হলে এই সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “চীনে শ্রমিক সংকট ও ভারতের ওপর হঠাৎ বাড়তি মার্কিন শুল্ক বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।” তবে তার মতে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং ঋণ সংকট এখনও শিল্পে বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছোট ক্রেতারাও আসছে
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, এবার ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাধারণত জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে তুলনামূলক কম অর্ডার আসে। কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারের বড় ক্রেতাদের পাশাপাশি ছোট ছোট ক্রেতারাও অর্ডার দিচ্ছেন। এর ফলে রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তার মতে, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এখন বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন—অতিরিক্ত অর্ডার নিতে গিয়ে যেন মূল্যছাড় না দেওয়া হয়। কারণ, একবার কম দামে বিক্রি শুরু হলে ভবিষ্যতে ক্রেতারা আর সঠিক দাম দিতে চাইবে না।
সরকারের করণীয়
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাড়তি অর্ডারের এই ধারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে সরকারের জরুরি ভিত্তিতে দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে: প্রথমত: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধান। দ্বিতীয়ত: চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বন্দরে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো। একই সঙ্গে প্রস্তাব এসেছে—অতিরিক্ত অর্ডার ব্যবস্থাপনায় শিল্পখাতকে সহযোগিতা করার জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করেছে। অর্ডারের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরেই রপ্তানি খাত ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ছুঁতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নীতি সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আর্থিক খাতের সংকট নিরসন জরুরি। সুযোগ যদি কাজে লাগানো যায়, তবে বৈশ্বিক বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।